আজ ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৮ই ডিসেম্বর, ২০২২ ইং

আইনের ইতিকথা

প্রাচীন ভারতে বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি রাজার নিকট অভিযোগ দায়ের করতো। বিচারক ও বিচারপ্রার্থীর মধ্যে তৃতীয় কেউ থাকতো না। রাজারা তাদের পরামর্শকদের অভিমতের ভিত্তিতে বিচারকার্য পরিচালনা করতো। বিচারকার্য পরিচালনায় বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত প্রধান্য পেত। মুসলিম শাসনামলে বিচারপ্রার্থীর পক্ষে ওয়াকিল নিয়োগের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। কাজী বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। মুফতি ও হিন্দু পণ্ডিতরা বিচারপ্রার্থীর পক্ষে মামলা পরিচালনায় আইনজীবীর ভূমিকা পালন করতেন। কাজী ও মুফতি শরিয়াহ আইনের বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হতেন।
বৃটিশ ভারতে মেয়র’স কোর্ট (১৭২৬) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইন পেশার সূচনা হয়। তখন উকিল হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট যোগ্যতার বিধান (qualifications) ছিল না। ১৭৭৪ সালে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হলে আইন পেশার সুনির্ধারিত কাঠামো ও বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত কর্ণওয়ালিশ কোড অনুযায়ী পেশাদার উকিলের মাধ্যমে মামলা পরিচালনার নিয়ম চালু হয়। সরকার পক্ষে মামলা পরিচালনা করার জন্য সরকারি উকিল নিয়োগ দিতো। ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনার জন্য সরকার উকিলদের সনদ প্রদান করতো। ১৭৯৩ সালের প্রবিধান-৭ এর অধীনে সদর দেওয়ানী আদালতের ওপর অধীনস্ত আদালত সমূহে আইন চর্চার জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের উকিল হিসেবে সনদ দেয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
১৮১৪ সালের প্রবিধান ২৭-এর আওতায় জেলা আদালত সমূহকে সংশ্লিষ্ট আদালতে আইন চর্চার জন্য উকিলদের সনদ প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয়। তখন পর্যন্ত শুধুমাত্র বৃটিশ ব্যারিস্টার, আইনজীবী ও এটর্নিরাই সুপ্রিম কোর্টে আইন চর্চার সুযোগ লাভ করতেন। ১৮৪৬ সালে লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারর্স এক্টের মাধ্যমে এই বৈষম্যমূলক বিধানের বিলুপ্তি ঘটে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। আইনজীবী তালিকাভুক্তির যোগ্যতা ও কার্যাবলীকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ১৮৫০ সালে ওকালতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের সনদ দেয়ার নিয়ম চালু হয়। লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারর্স এক্ট, ১৮৭৬ অনুযায়ী উকিল, মোক্তার ও রাজস্ব আদায়কারী এজেন্টদের সনদ প্রদানের ক্ষমতা হাইকোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। উকিলরা অধস্তন সকল ফৌজদারি, দেওয়ানি ও রাজস্ব দপ্তরে; মোক্তাররা ফৌজদারি এবং রাজস্ব এজেন্টরা রাজস্ব দপ্তরে আইন ব্যবসার সুযোগ লাভ করতেন। নারীরা তখনো এই পেশায় অংশগ্রহণ করতে পারতেন না। ১৯২৩ সালে লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার (ওইমেন) এক্টের মাধ্যমে নারীদের আইনপেশায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। উকিল, মোক্তার ও রাজস্ব এজেন্টের মধ্যকার পার্থক্যের বিলুপ্তি ঘটে ১৯৬৫ সালের লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স এন্ড বার কাউন্সিল এক্টের মাধ্যমে। এই আইনের অধীনে দুই-শ্রেণির অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির বিধান প্রবর্তন করা হয়। এক শ্রেণি হাইকোর্ট এবং অন্য শ্রেণি অধস্তন আদালত। অধস্তন আদালতের অ্যাডভোকেটরা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হাইকোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স এন্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর বিধান অনুসারে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল গঠিত হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইনজীবীদের লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করে আসছে। কাউন্সিল পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। এটর্নি জেনারেল পদাধিকার বলে কমিটির চেয়ারম্যন হিসেবে মনোনীত হন। বাকি ১৪টি পদের ৭টিতে সদস্যরা আইনজীবীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। অন্য ৭টি পদে স্থানীয় আইনজীবীদের থেকে নির্বাচিত হন। কাজের গতিশীলার জন্য বার কাউন্সিলের রয়েছে ৫টি স্থায়ী কমিটি। আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের জন্য বার কাউন্সিল কয়েকটি ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করেছে। বার কাউন্সিলর কতৃক ২০১৮ সালের প্রাকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী আইনজীবীর সংখ্যা ৪৩৮৮৪ এবং একই বছরে আরও ৭৭৩২ জন তালিকাভুক্ত হন। সংখ্যার বিচারে ৫০ (পঞ্চাশ) হাজারের অধিক হলেও ঠিক কতজন আইনজীবী সরাসরি আইন চর্চায় (প্র্যাকটিস) সম্পৃক্ত তা নিরূপণ করা দুরূহ।
লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স এন্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পূর্বে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ওই ব্যক্তিকে (১) বাংলাদেশের নাগরিক হবে (২) ২১ বছরের বেশি বয়সী হতে হবে (৩) (ক) বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকতে হবে, অথবা (খ) বার কাউন্সিল স্বীকৃত বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি থাকতে হবে, অথবা (গ) ব্যারিস্টার এট ল ডিগ্রি থাকতে হবে। (৪) বার কাউন্সিল কর্তৃক অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। (৫) এনরোলমেন্ট ফি পরিশোধ করতে হবে। লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স এন্ড বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২-এর বিধান ৬০ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পূর্বে অবশ্যই ১০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এডভোকেটের চেম্বারে ৬ মাস শিক্ষানবিশ কাল অতিক্রম করেতে হবে। একজন শিক্ষনবিশকে আইনজীবী হওয়ার জন্য তিন ধাপের (এম.সি.কিউ, লিখিত ও মৌখিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ২০১২ সালে আইন সংশোধন হওয়ার পূর্বে শুধুমাত্র লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সনদ প্রদান করা হতো। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ায় এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেটস এক্টের মাধ্যমে ভারতে ‘ইন্ডিয়ান বার কাউন্সিলের’ যাত্রা শুরু হয়। ভারতের আইনজীবী তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমাদের দেশের প্রক্রিয়ায় অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। তবে রাজ্যভেদে নিয়মের কিছুটা তারতম্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে আইনজীবী তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর ও মানসম্পন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে সনদ প্রদানের পূর্বে আইনজীবীদের শপথ বাক্য পাঠ করানোর ব্যাতিক্রমী বিধান চালু রয়েছে

আমিনুল ইসলাম জয়

আইনজীবী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ